মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৩১ তম বার্ষিকী পালিত হয়ে গেল গত ১৬ ডিসেম্বর ২০০২। তারই প্রাক্কালে নোয়াখালী’র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার একটি অকথিত কাহিনী নিয়ে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য ছুটলাম নোয়াখালী জেলা সদর থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায়। সেখানে কালের স্বাক্ষী চৌরাস্তা “কালো পুল” যা বর্তমানে পাকা ব্রিজ। তারই দক্ষিণে তথা চৌরাস্তা সংলগ্ন বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাই স্কুল। এই উভয় স্থানই ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর মানবতা বিরোধী জঘন্য হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্র। সেখানে আজও নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি ফলক। স্বীকৃতি পায়নি বধ্যভূমির। এই স্থানের মাটির গভীরে আজও আছে অসংখ্য নারী পুরুষের গণ কবর। সেই গণকবরে গুমরে কাঁদে শহীদের আত্মা। আমরা কেউ কখনও তার খবর রাখিনি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণী তথা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে লোকচক্ষুর সামনে নিয়ে আনার চেষ্টা থেকে এ তথ্যানুসন্ধান।
একাত্তরের ২৬ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করার পর ২২ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা ছিলো হানাদার মুক্ত। ২২ এপ্রিল বিকেল ৫টায় ৬০-৭০ টি যান্ত্রিক বহর নিয়ে পাকিন্তানী সামরিক কনভয় কুমিল্লা-লাকসাম-সোনাইমুড়ি হয়ে বেগমগঞ্জের মীরওয়ারিশপুর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে চৌরাস্তা অভিমুখে রওয়ানা হয়।ঐ দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সে সময়ের মিরওয়ারিশপুর গ্রামের তরুণ যুবক বর্তমানে আইনজীবী এবিএম ফারুক (৫০) বলেন, "ঐ দিন পাকবাহিনী বেচার দোকান সংলগ্ন আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে অবস্থানরত আমার বাবা জনাব ফরিদ মিয়া (টিটি) এবং আমার ভাই মোঃ ফয়েজকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। আমি তখন বাড়ির অদূরে লুকিয়ে ঐ হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করি। এর পর পাকবাহিনী কালো পুল অভিমুখে রওয়ানা হয়। পুলের সন্নিকটে এসে পাক সামরিক কনভয় থমকে দাঁড়ায়। পাক সামরিক কনভয় আসার আগেই স্থানীয় জনসাধারণ কালো পুল ধ্বংস করে দেয়। এতে উত্তর দক্ষিণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাক সামরিক কনভয় চৌরাস্তায় আসার পথে কালো পুলের দক্ষিণ প্রান্তে একটি প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্মুখিন হয়। সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় শহীদ সালেহ আহম্মদ, জহিরুল ইসলাম, পিন্টু প্রমুখ। ঐ পাক সামরিক শক্তির নিকট পরাভূত হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ স্তিমিত হলে পাক সামরিক বাহিনী ঝুলন্ত সেতু নির্মান করে সন্ধ্যা নাগাদ কালো পুল অতিক্রম করে বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাই স্কুলে অবস্থান নিয়ে ক্যাম্প স্থাপন করে।"
একাত্তর এর ৯ মাসে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের মিরওয়ারিশপুর গ্রামের কিশোর সারোয়ার আলম (৪৫) জানান, “বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাই স্কুলের ক্যাম্পে পাকিন্তানী হানাদার বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার ছিলো মেজর বোখারী। এই ক্যাম্পটি ছিলো পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নোয়াখালী জেলার মূল ঘাঁটি।“
একাত্তর এর টগবগে যুবক আবদুস সোবাহান বর্তমান বয়স ৬৫ বছর। বাড়ি চৌরাস্তা সংলগ্ন নাজিরপুর গ্রামে। একাত্তরের পুরো নয় মাস আবদুস সোবাহান চৌরাস্তার কালো পুলের পূর্ব পার্শ্বের বেহাল জালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। তখন কালো পুল, কাঠের পুল ছিলো অনেকটাই ভাঙ্গাচোরা। তার পাশেই নির্মিত হয়েছে বর্তমানের পাকা ব্রিজ। আবদুস সোবাহান বলেন, “পাক সামরিক বাহিনী টেকনিক্যাল হাই স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করার পর পরেই মাইজদী থেকে ৫ জন নিরপরাধ স্বাধীনতাকামী বাঙালীকে ধরে এনে কালো পুলের উপরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। একজন সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যান। এভাবে পাক হানাদার বাহিনী এ অঞ্চলে নিরপরাধ মানুষ হত্যা শুরু করে।মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসে প্রতিদিন কালো পুলে সর্বনিম্ন ৫/৬ জন ও সর্বোচ্চ ১৫/২০ জন করে মানুষ হত্যা করতো পাকিস্তানী সৈন্যরা। নানা নিষ্ঠুর পন্থায় ওরা হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠতো। নোয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নিরপরাধ মানুষগুলোকে ধরে এনে প্রথমে টেকনিক্যাল হাই স্কুল ক্যাম্পে শারীরিক নির্যাতন করা হোত- তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কালো পুলের উপর দাঁড় করিয়ে বুলেট বেয়নেটে ঝাঁঝরা করা হতো। এভাবেই চলতো স্বাধীনতাকামী নিরপরাধ মানুষদের উপর মানবতাবিরোধী জঘন্য হত্যাযজ্ঞ। বুলেট বেয়নেট এ ঝাঁঝরা হওয়ার পর লাশগুলো ওয়াপদা খালের পানি খুন রাঙা রঙে রাঙিয়ে ভাসতে ভাসতে পশ্চিমে চলে যেতো। এই টেকনিক্যাল হাই স্কুলের ক্যাম্পেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় চৌমুহনী কলেজের প্রাক্তন প্রধান করণিক মিরওয়ারিশপুর গ্রামের গুলজার হোসেনকে।“
মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস এভাবেই হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে অবশেষে ডিসেম্বর ৫-৬ তারিখে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় জেনে টেকনিক্যাল হাই স্কুলের ক্যাম্প গুটিয়ে লাকসাম হয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে চলে যায়। কিন্তু তারা রেখে যায় সেখানে অনেক নৃশংসতার চিহ্ন। বহু নারীর সম্ভ্রম হারানোর অব্যক্ত কান্না। অসংখ্য মৃত-অর্ধমৃত নর নারীর কঙ্কালসার দেহ।
► লেখক: গোলাম আকবর, সদস্য সচিব, নোয়াখালী মানবাধিকার জোট
► নোয়াখালী জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত স্মারক স্বাধীনতা ২০০৩ থেকে নেয়া হয়েছে। প্রকাশকালঃ মার্চ ২০০৩।
গণহত্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গণহত্যা লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর, ২০০৭
শ্রীপুরের গণহত্যা

সোনাপুর নোয়াখালী পৌরসভার সর্বদক্ষিণের একটি ছোট গ্রাম। এর চারপাশে মহব্বতপুর, শ্রীপুর, জালিয়াল, করিমপুর, গোপাই ও পশ্চিম বদরীপুর। কবি বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতি বিজড়িত নোয়াখালী শহরটি এর দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে ছিল একদা। পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের গোটা সময়টা সোনাপুর ছিলো নোয়াখালীর প্রাণকেন্দ্র।এখানে জেনারেল আইয়ুবের প্রতি বিক্ষোভ হয়েছে, মেজর জেনারেল আজম খানের প্রতি ‘ফিরে যাও’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে, পাকিস্তানি জান্তার দালাল ফ.কা চৌধুরীর প্রতি ঘৃণামিশ্রিত কালো পতাকা উথ্বিত হয়েছে। সৈরশাসকের দোসর এখানে জনগণের সম্মানসূচক রায় পায়নি। ২৩ মার্চ ১৯৭১ সনের পরবর্তী প্রথম দশ দিনের মধ্যে অপরিণত মুক্তিযোদ্ধাদের দল সংগঠিত হয়েছে। স্থানীয় মিশনারী উচ্চ বিদ্যালয়ে বোমা বানাতে গিয়ে পশ্চিম বদরীপুর গ্রামের কৃতিসন্তান বাহারুল আলম চৌধুরী আহত হয়েছেন। পরবর্তীকালে আহত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে এই সোনাপুর এলাকার আধ কিলোমিটার দূরত্বে স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত হয় একটি হিন্দু সাধুর আখড়া ও একটি খ্রীস্টানদের গীর্জা। ৪০০ বর্গ কিমি বিন্যস্ত বিশাল চরের পশ্চাতে শান্তিপূর্ণ জনপদ বেষ্টিত সোনাপুর বাজার ও সংলগ্ন শ্রীপুর গ্রামের উপর পাকিস্তানি আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ এক বিরল নিষ্ঠুর গণহত্যা।
ইসলামপ্রীতির কথা বাদ দিলেও পাকিস্তানিদের একটা অহমিকা ছিলো তাদের সৈন্যবাহিনীর ক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়ে। ১৮ জুন ১৯৭১ সালের বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কারণ কি এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের সাথে এই ধ্বংসযজ্ঞের সম্পর্ক কোথায়- তা নির্ণয় করা কঠিন। জাতিসংঘের সদস্যপদপ্রাপ্ত ইসলাম রক্ষার সংগঠন পাকিস্তানের নিয়মিত সৈন্যবাহিনী নি:সন্দেহে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ক্ষমতাকে করেছে সুসংগঠিত। এরকম অহমিকায় প্রদীপ্ত দেশের সৈন্যবাহিনীর আচরণ ও শিক্ষার বাস্তব প্রকাশ ভাবার বিষয়। যে কোন রাষ্ট্রের নিজস্ব সংগঠন তার সৈন্যবাহিনী। হত্যা, ধ্বংস, আক্রমণ বা প্রতিরোধ যে কোন কাজেই তার উদ্দেশ্য থাকে। কারণহীন সামরিক এ্যাকশন সৈন্য, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালকদের ব্যাপারে ভীতির সঞ্চার করা ছাড়া আর কোন অর্থ বহন করে না।সময়ে ভাড়াটিয়া বুদ্ধি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পোষাকি মানবপ্রীতি, তথাকথিত মুসলিম দেশ পাকিস্তানের প্রতি মমতাবোধ ও ইসলামদরদী সেজে সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারলেও ওদের আসল চরিত্র উন্মোচিত হতে সময় নেয়নি। অকারণে গণহত্যা, সম্পদ লুন্ঠন ও গণতন্ত্র হত্যার কাজে পাকিস্তানি শাসক মহলের জুড়ি নেই। আজ স্মৃতিরোমন্থন করে শিহরিত হচ্ছি- কেমন করে প্রতারক শোষকশ্রেণীর খপ্পরে ছিল বাংলার মেহনতী সাধারণ মানুষ চব্বিশটি বছর।
এপ্রিলে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর হাতে শহর পতনের পর থিতিয়ে আসছিলো উত্তেজনা। নোয়াখালী শহরে জেঁকে বসে গেছে মুসলিম লীগ ও জামাতের পাকিস্তানি দালালদের প্রশাসন। গঠিত হয় শান্তি কমিটি, ঘাপটি মারা নিরীহ সেজে থাকা পাকিস্তানি দোসররা বাঘ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের উপর। ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট লুট হয়ে ছারখার। শহরের হিন্দু বসতি প্রায় নিশ্চিহ্ন। সোনাপুর এলাকার খ্রীস্টান জনগোষ্ঠী নিশ্চিত কোনপক্ষই তাদের প্রতি বিরাগ হতে পারবে না। তারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পক্ষে নানা সাহায্য সহানুভূতিতে আগুয়ান।
তখনকার নোয়াখালীর চালচিত্র অনেকটা শোকাহত মায়ের শোক সামলে ওঠার পর ধীর মন্থর গতিতে সংসারের হাল ধরার মত অবস্থা।স্বাধীনতার দীপ্তি আগুনের মতো বাংলা প্রেমিকদের হৃদয়ে জ্বলছে। অসহায় মানুষেরা প্রত্যক্ষ করছে রাজাকার, মুসলিম লীগ, আর জামাতিদের জঘন্যতম কাজগুলো। মনে পড়ে এক হিন্দুর বাসা দখলের পর টাইটেল পাস জামাতের শহর নেতা স্বহস্তে গাছ কেটে সাফ করে ফেলছেন। বিস্ময়াভিভূত দর্শকের জিজ্ঞাসা, “গাছের কি দোষ”? ইসলামপন্থী মাওলানার সংক্ষিপ্ত জবাব- “হিন্দুর চিহ্ন ও রাখবো না, হিন্দু কাফের, হিন্দুর ফুল ও কাফের”।এই ছিলো পাকিস্তানিপ্রেমীদের মানসিকতা। শোনা যায় এই মাওলানা এখনও রাজনীতি করেন। এখনও বাংলাদেশে ইসলাম কায়েমের স্বপ্ন দেখেন। আরেক কোরআনে হাফেজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা নিধনের অজুহাতে খলিফারহাট এলাকায় তিনমাসের প্রসূতি মহিলাকে গণধর্ষণের পর তার গোপন অঙ্গে লবণ-মরিচ মেখে দিয়ে বীরের মতো যুদ্ধ জয় করে পাষন্ডরা। নাদির শাহীর কায়দায় লুন্ঠিত দ্রব্য এরা পরস্পরের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করত। এ সবই পাকিস্তানের বজায় রাখার লড়াইয়ের ইতিহাস। ইসলামের মহত্ত্বকে কালিমা লিপ্ত করার জন্য ধর্মব্যবসায়ী ও ক্ষমতালিপ্সু পিশাচেরা দায়ী। মুসলমান ও ইসলাম কখনও মানুষের মঙ্গল ছাড়া ক্ষতির চিন্তা করে না। কোন অত্যাচারী জুলুমবাজ শোষকের সাথে অন্তত আর যাই হোক মুসলমানদের সম্পর্ক থাকতে পারে না।
সোনাপুর নামের অবতারণা দিয়ে এই টুকরো কথা লেখা শুরু করেছিলাম। সোনাপুরে সংগঠিত পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরর্থক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা কোথাও বিবৃত হয়নি। আগেই বলা হয়েছে বাংলার দক্ষিণে রেল আর পাকা সড়কের থমকে যাওয়া জনপদ ‘সোনাপুর’ সাহসী মানুষের সুখী ও অসাম্প্রদায়িক জীবন আর চিরদরিদ্র খেটে খাওয়া জনস্রোতের এক আশ্চর্য আশ্রয়। মাত্র এক বর্গকিলোমিটার এলাকাকে রিক্সার চারণভূমি বলা যাবে। মসজিদ মাদ্রাসার পীঠস্থান বলা যাবে। হিন্দু-খ্রীস্টানের মিলনস্থান বলা যাবে, আর বলা যাবে শিক্ষার কেন্দ্রভূমি।১৯৭১ সালের ১৮ জুন। মাত্র ৪০০ গজ রাস্তার দুই ধারে ‘টি’ অক্ষরের মত সাজানো ছোট ছোট দোকানের পসরা বসেছে। একপাশে অলসভাবে শুয়ে থাকা লাল রেলস্টেশন ঘর, তারের পুকুর, বকশির মসজিদ, দরিদ্রতম মানুষের গায়ে লাগা ঘরের চরিলাই, রসিদ হিমাগার, কয়হাত পরেই বেড়ী বাঁধের কোলঘেঁষে নেমে গেছে দক্ষিণে বহুদূরে জেগে ওঠা চরের সমারোহ।সুপারি চারা, নারিকেল ও কলার পাতার আড়ে ছোট ছোট ঘরের বিরল বসত। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে, দুপুরের ঘুম স্তব্ধতা ভেঙ্গে চা-দোকানের কোলাহল- বিকাল নামছে ধীরে ধীরে। মসজিদ-মাদ্রাসার আজান আর বৈকালিক ট্রেনের শব্দে জেগে উঠছে মহব্বতপুর, শ্রীপুর, পশ্চিম বদরীপুর আর করিমপুর।
বেলা চারটায় উত্তরের পাকাসড়ক ধরে ছুটে এল শব্দময় দানব বাস, ট্রাক, লরি। স্থানে স্থানে উগরে দিলো চাইনিজ অটোমেটিক হাতে পাকিস্তানি সেনাদের। সর্বদক্ষিণে ছুটে এসে একটি বাস থামলো। ‘টি’ –এর পশ্চিম বাহুতে ছুটে গেলো একদল। উত্তর দিকের শ্রীপুর ও করিমপুর গ্রামে ঢুকলো একদল সেনা। মোক্তারবাড়ীর চারপাশ ঘিরে ঘনবসতির ঘেরে ঢুকে গেলো পাকিস্তানি হানাদাররা। উত্তর সোনাপুর এলাকায় আগেই নেমে পড়েছিলো একদল। পাকিস্তানি সেনাদলের কোন ঘোষণা নেই, অনুসন্ধান তত্পরতা নেই, নেই কোন প্রতিরোধের প্রতীক্ষা।‘টি’ –এর পশ্চিমপ্রান্ত থেকে প্রথমগুলির সংকেত পাওয়া গেলো। সন্ত্রস্ত ভীত দোকানে বসে-দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, অসহায় ছোটাছুটি, নির্বিচারে লুট করছে।গুলি করছে আগুন লাগাচ্ছে তারা। মুহুর্তে চার’শ গজ এলাকা নরকে পরিণত হলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন, জ্বেলে গেল দোকান, ঘর-বাড়ী, খুন হয়ে গেলো শতাধিক জন মানুষ।পুড়ে ছাই হয়ে গেলো অনেকেই দু’ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রতিবাদ প্রতিরোধহীন সোনাপুর আর তার চারপাশের গ্রামে নেমে এল এক শ্মশানের নিস্তব্ধতা।দোকানে লাশ, দোকানের সামনে লাশ, ডাক্তার, ডাক্তারের কাছে আসা রোগী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ কোন স্তরের মানুষই বেঁচে থাকার আকুতি ছাড়া পাকিস্তানি বীর সৈনিকরা কোন প্রতিরোধের সম্মখীন হয়নি। মুক্তিযোদ্ধার হাতিয়ার দুরে থাকুক, চোর তাড়ানোর একটি লাঠি, বল্লম ও তাদের চোখে পড়েনি। তবুও তাদের জিঘাংসার আগুনে প্রাণ দিয়েছে এক’শ চব্বিশ জন মুসলমান ও এক জন মুচি। রিক্সাচালক, মুটে মজুরের মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠিত হয়েছে অগণিত। প্রবীণা, যুবতী পর্দানশিন নারীর ঘোমটা উন্মোচিত হয়েছে পাকিস্তানি বর্বরদের কামনিষ্ঠুর ভয়ালথাবায়। এই অপমানের কথা কেউ কোনদিন জানবেনা। এই নিষ্ঠুর হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠনের ক্ষত কেবল তীব্র ঘ্রণা হয়ে জেগে আছে সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে। বহু ছোট ব্যবসায়ী দোকান হারিয়ে চিরদিনের জন্য দরিদ্র হয়ে গেছে স্বাধীনতা পরবর্তী পুনর্বাসন তাদের জীবনে আর্থিক স্বস্তি আর ফিরিয়ে দিতে পারেনি কোনদিন। দু’শ পঁচিশটি ছোট-বড় দোকানে লুন্ঠন চালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। পাঁচশটি পরিবারের প্রতিটি ঘরে ঢুকেছে হানাদার। এ লুন্ঠন, ধর্ষণ আর পালিয়ে যেতে না পারা মানুষদের হত্যা, প্রতিটি পরিবারে এনেছে শোকের করুণ ছায়া। পাকিস্তানি সৈন্যদের অবস্থান ছিলো দু ঘন্টা পনের মিনিট মাত্র। বর্বরতার নিদারুণ লজ্জ্বা এদের স্পর্শ করেনি। ঝড়ের বেগে এসে ঝড়ের বেগে নিরাপদে ফিরেছে, বিশ্ববেহায়া নির্লজ্জ বীরপুঙ্গবেরা। পাকিস্তানি লীগ-জামাতের সেদিনের সাথীরা মানুষের দুর্দশায় হেসে বিজয়ীর বেশে কোলাকুলি করেছে। সৈন্যবাহিনীর যে কোন “এজেল্ট” এ অন্তত শত্রুবাহিনীর কোন না কোন তত্পরতার নমুনা থাকে।সোনাপুর অপারেশন ছিলো ঠান্ডা মাথার হত্যাযজ্ঞ। নিরীহ মানুষের রক্তে হোলিখেলার উত্সব। দেশরক্ষা ও ইসলামের নামে ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের নিষ্ঠুর হোলিখেলার জবাব একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা দিয়েছে। কিন্তু ধর্মের নামে এ ধরনের নিষ্ঠুরতার অবসান কি হয়েছে এদেশে?
* লেখকঃ ত. ম ফারুক
প্রকাশকালঃ ২ জুলাই ১৯৯৮
** লেখাটি রবিউল হোসেন কচি সম্পাদিত নোয়াখালী পৌরসভা কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক স্মারকগ্রন্থ “নোয়াখালী” থেকে নেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৭
গোপালপুরে গণহত্যা
নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানা সদর থেকে আনুমানিক নয় কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তর দিকে গোপালপুর বাজারের অবস্থান। এরই পশ্চিমপার্শ্বে কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে গোপালপুর মির্জানগর পরগণার এক সময়ের প্রভাবশালী জমিদার বাড়ী। এছাড়া বাজারের কোলঘেঁষে গোপালপুর আলী হায়দার উচ্চ বিদ্যালয়। পশ্চিম-উত্তর মাথায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাংক ও পোস্ট অফিস।মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবু কায়েস মাহমুদ, মোঃ মোহসীন দুলাল, জাকির হোসেন, মাহমুদুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এ এলাকার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ আনিছুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা নিম চন্দ্র ভৌমিক, সাহাবউদ্দিন মিন্টু ও স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খসংগঠিত করার কাজ শুরু হয়।
এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী নোয়াখালীতে প্রবেশ করার কিছুকাল পরও গোপালপুর রয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের দূর্জয় ঘাঁটি হিসাবে; পরিণত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং সেন্টারে। চলতে থাকে যুদ্ধের প্রাথমিক কলাকৌশলের ট্রেনিং। সময়ের সাহসী সন্তানেরা দলে দলে প্রাথমিক ট্রেনিং সমাপ্ত করে চূড়ান্ত ট্রেনিং গ্রহণের জন্য গোপনে চলে যেতো বজরার বগাদিয়া আফানিয়া হয়ে ভারতের দিকে। গোপালপুর এভাবেই পালন করে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এক অগ্রণী ভূমিকা। এ খবর পৌঁছে যায় জামাত, মুসলীম লীগ ও শান্তি কমিটির মাধ্যমে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছে। তারা কয়েক দফা চেষ্টা চালায় এ এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের খুঁজে বের করার জন্য। দেখতে দেখতে চলে আসে বর্ষা।
সময়টা ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। প্রচুর বৃষ্টি হয় সেবার ১৮ আগস্ট রাতে। ভোররাতে বেগমগঞ্জ লক্ষীপুর সড়কের কাছে বাংলাবাজার শামসুননাহার হাইস্কুলে এসে অবস্থান নেয় বেশ কিছু পাকিস্তানী মিলিশিয়া ও রাজাকার। ১৯ আগস্ট সকাল বেলা - সূর্য তখনো মেঘের আড়ালে ঢাকা। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল আনুমানিক আটটা নাগাদ গোপালপুর বাজারে পৌঁছে যায় প্রায় কয়েকশ পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার। তারা দুভাগে বিভক্ত হয়। রাজাকারদের কুড়ি/পঁচিশ জনের একটি দল বাজারের পশ্চিমদিক দিয়ে এবং বাকীরা মূল রাস্তা দিয়ে এসে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সকাল থেকেই বাজারের প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান অগণন মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত ছিলো। কেউ চা পানে রত। আবার কেউ গতরাতে আশেপাশের কোন কোন এলাকায় গোলাগুলি হয়েছে তার অবস্থান নির্ণয় নিয়ে বিতর্করত। এমন সময় অতর্কিত হানা দিলো পাকিস্তানী হায়েনার দল। যারা পালাতে পারলো তারা বাঁচলো। যারা পারেনি এরকম অর্ধশতাধিক দূর্ভাগা নিরীহ গ্রামবাসী ও দোকানী শিকার হল নির্মম হিংস্রতার। একে একে ওদের সবাইকে ধরে এনে এক লাইনে দাঁড় করানো হয় বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট খালটির পাড়ে। এ দলে ছিলেন ঐ এলাকার শান্তি কমিটির নেতা। তার অপরাধ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন। তাঁর কাছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার জানতে চায়- আনিস ডাক্তার, সুবেদার মেজর জবেদ আলী কোথায়? কোনো দেশপ্রেমিক মুক্তিপাগল মানুষ তাদের এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয় এবং তারা এর কোন জবাব কোনদিনই পায়নি। বাজারের দোকানে দোকানে তল্লাশি করে খুঁজতে থাকে স্বাধীন বাংলার পতাকা। জনৈক ছিদ্দিকউল্যাহর দোকানে ওরা পেয়ে যায় স্বাধীন বাংলার একটি পতাকা।- ক্রোধে ফেটে পড়ে ওরা। লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন মুসল্লিকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকী প্রায় পঞ্চাশজন নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষকে ব্রাশফায়ার করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ব্রাশফায়ারের পরও যারা বেঁচেছিলো তাদেরকে বেয়নেট চার্জ করে পৈশাচিক উল্লাস প্রকাশ করার পর পাকিস্তানী পশুরা হত্যা করে। মানুষের তাজা রক্তে সয়লাব হয়ে যায় খালের পানি। রক্ত আর পানিকে পার্থক্য করা যায়নি। এই হতভাগ্য মানুষদের অপরাধ ছিলো- তারা বলেনি কারা এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কারা মুক্তিযোদ্ধা। তাদের অপরাধ, দোকানে পাওয়া যায় স্বাধীন বাংলার পতাকা।
এই হত্যাকান্ড জঘন্য বর্বরতা। মানবতাবিরোধী। নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গোপালপুরের এই গণহত্যা এক কালো অধ্যায়। এই ঘটনায় যারা শহীদ হন তাদের পঁচিশ জনের নাম পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়:
১. মাহবুবুল হায়দার চৌধুরী [নশা মিয়া] (গোপালপুর)
২. দীন ইসলাম (তুলাচরা)
৩. হাবিব উল্যাহ (তুলাচরা)
৪. ইসমাঈল মিয়া (তুলাচরা)
৫. অহিদউল্যাহ (সাহাদাপুর)
৬. মোহাম্মদউল্যাহ (সাহাদাপুর)
৭. মোহাম্মদ উল্যাহ (সাহাদাপুর)
৮. দুলাল মিয়া (সাহাদাপুর)
৯. সামছুল হক মাস্টার (আটিয়াকান্দি)
১০. মজিবউল্যাহ (আটিয়াকান্দি)
১১. বশিরউল্যাহ (আটিয়াকান্দি)
১২. আবুল কাশেম (মির্জানগর)
১৩. আবুল বশর ছিদ্দিক (মির্জানগর)
১৪. হারিছ মিয়া (দেবকালা)
১৫. ছিদ্দিক উল্যাহ মিয়া (সিরাজউদ্দিনপুর)
১৬. মমিনউল্যাহ মিয়া (মুহুল্লাপুর)
১৭. মন্তাজ মিয়া (মহল্লাপুর)
১৮. নূর মোহাম্মদ (মহল্লাপুর)
১৯. আবদুল মন্নান (মহল্লাপুর)
২০. মোবারক উল্যাহ (পানুয়া পাড়া)
২১. মোহাম্মদ উল্যাহ দর্জি (চাঁদ কাশেমপুর)
২২. আবদুর রসিদ (আমিরাবাদ)
২৩. আবদুল সাত্তার (বারাহীনগর)
২৪. আবদুল করিম (হীরাপুর)
২৫. ডা: মোহাম্মদ সুজায়েত উল্যাহ (দশঘরিয়া, চাটখিল)
১৯৭১ সালের ১৯ আগস্টের এই নিষ্ঠুর গণহত্যার স্মরণে গোলাম ছাত্তার নোমান, তপন কুমার ভৌমিক প্রমুখের প্রচেষ্টায় ১৯৮০ সালে শহীদদের নাম খোদাই একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও শহীদ স্মৃতি সংসদ গড়ে উঠে। প্রতি বছর এই দিনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।
[লেখক: গোলাম আকবর, সদস্য সচিব, নোয়াখালী মানবাধিকার জোট]
এতে সদস্যতা:
পোস্টগুলি (Atom)