rss

জালছেঁড়া নদী

জালছেঁড়া নদী
আমার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০০৯। প্রকাশক: ভাষাচিত্র, ৩য় তলা, আজিজ সুপার মার্কেট, ঢাকা।

প্রান্তজন

প্রান্তজন
শহীদুল ইসলাম মুকুল
নোয়াখালী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
নোয়াখালী লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ২২ মার্চ, ২০০৮

নদীগর্ভে বিলীন পুরনো শহর নোয়াখালী


নোয়াখালীতে কেউ বেড়াতে এলে অবাক হয় জেলা শহরের নাম শুনে। বাংলাদেশে নোয়াখালীই একমাত্র জেলা, যার জেলা শহরের নাম জেলার নামে নয়। নোয়াখালী’র জেলা শহরের নাম মাইজদী। কেন নোয়াখালী’র জেলা শহরের নাম মাইজদী হলো তা জানতে হলে পিছনের ইতিহাস জানতে হবে।

নোয়াখালী জেলার পত্তন হয় ১৮২১ সালে। বৃটিশ প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ ১৮২২ সালে নোয়াখালীর জন্যে একটি জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেটের পদ সৃষ্টি করে। একজন স্বতন্ত্র কালেকটর নিযুক্ত হয় ১৮৩০ সালে। জেলা হিসেবে নোয়াখালী পূর্ণ মর্যাদা লাভ করে ১৮৭৬ সালে। ঐ বছরেই নোয়াখালীতে একজন সেসন জজ ও সিভিল জজ নিয়োগ করা হয় এবং প্রথম পৌরসভা গঠিত হয়। সুধারাম মজুমদার নামে এক ব্যক্তির দানকৃত স্থানে শহরটি স্থাপিত হয়েছিল বলে প্রথম থেকেই এই শহর সুধারাম নামে পরিচিতি লাভ করে।
নোয়াখালী শহরের ইতিহাস ভাঙা গড়ার ইতিহাস। কথায় বলে,
“ভাঙ্গা-গড়া চোরাবালী
তার নাম নোয়াখালী”
চল্লিশের দশকে নোয়াখালী অনেক ছোট ছিলো। শহরটি আরো দক্ষিণে বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে গড়ে উঠেছিলো। কালক্রমে নদী ভাঙনের ফলে উত্তরে সরে আসে। নদী ভাঙনের ফলে কালক্রমে নোয়াখালীর মূল শহরটি উত্তরাংশ অর্থাৎ সোনাপুর হতে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

নোয়াখালী শহর নদীগর্ভে বিলুপ্তির কাজটি ত্বরান্বিত করে নোয়াখালী খাল। সাগরের প্রবল জোয়ার এই খালটির মধ্যদিয়ে এসে জেলার তীরবর্তী এলাকায় প্রচন্ডভাবে আঘাত হানতো। নদীর ভাঙন যখন সর্বগ্রাসী মূর্তি ধারণ করে নোয়াখালী শহরকে গ্রাস করতে উদ্যত ঠিক সে সময়ে দীর্ঘ প্রবাস জীবনযাপনের পর সুধারামে ফিরে এসেছিলেন খ্যাতনামা ইঞ্জিনিয়ার ওবায়দুল্লাহ। নদীর ভাঙন থেকে নোয়াখালী শহর তথা সুধারামকে রক্ষার জন্য তিনি বিভিন্ন পর্যায়ে দেন দরবার শুরু করেন। কিন্তু ততকালীন সরকার বাঁধ দিয়ে শহর রক্ষা করা সম্ভব নয় বলে অভিমত প্রদান করলে জনাব ওবায়দুল্লাহ নিজ উদ্যোগে ও অর্থব্যয়ে কয়েক হাজার শ্রমিকের সাহায্যে মন্তিয়ারঘোনার মুখে একটা বিরাট বাঁধ নির্মান করেন। জনাব ওবায়দুল্লাহর মৃত্যুর পর নানা কারণে সেই বাঁধের রক্ষণাবেক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর তাই অচিরেই জাঁকজমকপূর্ণ বর্ধিষ্ণু এ শহরটি তার সকল এতিহ্য নিয়ে ক্ষুদ্ধ মেঘনার করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে গেলো। নদী ভাঙনের পর সোনাপুর থেকে দত্তের হাট পর্যন্ত পুরনো শহর তথা পৌরএলাকার ভগ্নাংশটুকুই অবশিষ্ট রইলো।

কালিতারা বাজারের কাছে মিউনিসিপ্যালিটির যে শেষ লাইটপোস্ট ছিলো, ঠিক ওখানে গিয়েই নদীর ভাঙনটা বন্ধ হয়ে গেলো। বিচ্ছিন্ন উপকূল হিসেবে সোনাপুর রক্ষা পেলো। আর মূল শহরটা শুধু পৌরসভা সীমারেখা বরাবর বিলুপ্ত হয়ে গেলো।

১৯২২ থেকে ১৯৩২ এবং ১৯৪৮ থেকে পর্যায়ক্রমে মোট চারদফা ভাঙনের পর নোয়াখালী শহরটি তার বাগ-বাগিচা এবং দর্শনীয় সৌধমালাসহ চিরকালের মতো হারিয়ে যায় ভূ-পৃষ্ঠ থেকে।

পুরনো শহর নদী গর্ভে বিলুপ্ত হওয়ার পর ১৯৫০ সালে জেলার সদর দপ্তর অস্থায়ীভাবে মাইজদীতে স্থানান্তর করা হয়। পুরনো শহরের নদী ভাঙা মানুষগুলো তাদের বাড়ী-ঘর, দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সহায় সম্পত্তি সবকিছু হারিয়ে বাঁচার আশায় মাইজদীতে কোন রকম মাথা গোঁজার মত ঠাঁই করে নেয়। ক্রমান্বয়ে এখানে বসতি ও জনপদ গড়ে উঠে। ১৯৫৩ সালে শহরের পুরনো এলাকা কালিতারা, সোনাপুর ও মাইজদীসহ কাদির হানিফ ইউনিয়নের কয়েকটি মৌজা নিয়ে গেজেট বিজ্ঞপ্তিতে নোয়াখালী পৌর এলাকা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সুদীর্ঘ প্রায় একযুগ পর্যন্ত মাইজদীকে নোয়াখালী জেলার সদরদপ্তর হিসেবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিতর্কিত অবস্থায় ছিলো। অবশেষে ১৯৬২ সালে মাইজদীকে নোয়াখালী জেলার স্থায়ী সদর দপ্তর হিসাবে সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

নদী এখন আর কাছে নেই। চর পড়তে পড়তে দক্ষিণে সরে গেছে চল্লিশ কিলোমিটারের ও বেশি। নদীগর্ভ থেকে জেগে উঠেছে বিশাল চরাঞ্চল। নতুন করে গড়ে উঠেছে জনবসতি। কিন্তু সাথে নিয়ে গেছে আদি নোয়াখালী শহরের সবকিছু। শুধু স্মৃতিটুকুই আছে। 

সহায়ক প্রবন্ধসমূহ:
► নোয়াখালী পৌরসভা পরিক্রমা: মোহাম্মদ শামছুল আলম
► নোয়াখালীর ঐতিহাসিক ও ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য: সানাউল্লাহ নূরী
►মেঘনা গর্ভে নোয়াখালীর প্রাচীন শহর: সালাদিন
► স্মারকগ্রন্থ “নোয়াখালী": নোয়াখালী পৌরসভা
► ছবি: উইকিপিডিয়া

ফেইসবুকে যোগ করুন

শুক্রবার, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮

বেগমগঞ্জ কালো পুলের বধ্যভূমি

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৩১ তম বার্ষিকী পালিত হয়ে গেল গত ১৬ ডিসেম্বর ২০০২। তারই প্রাক্কালে নোয়াখালী’র মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার একটি অকথিত কাহিনী নিয়ে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য ছুটলাম নোয়াখালী জেলা সদর থেকে ৬ কিলোমিটার উত্তরে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায়। সেখানে কালের স্বাক্ষী চৌরাস্তা “কালো পুল” যা বর্তমানে পাকা ব্রিজ। তারই দক্ষিণে তথা চৌরাস্তা সংলগ্ন বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাই স্কুল। এই উভয় স্থানই ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর রাজাকার আলবদর বাহিনীর মানবতা বিরোধী জঘন্য হত্যাযজ্ঞের কেন্দ্র। সেখানে আজও নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি ফলক। স্বীকৃতি পায়নি বধ্যভূমির। এই স্থানের মাটির গভীরে আজও আছে অসংখ্য নারী পুরুষের গণ কবর। সেই গণকবরে গুমরে কাঁদে শহীদের আত্মা। আমরা কেউ কখনও তার খবর রাখিনি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে নিরপরাধ মানুষকে হত্যার রোমহর্ষক বিবরণী তথা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসকে লোকচক্ষুর সামনে নিয়ে আনার চেষ্টা থেকে এ তথ্যানুসন্ধান।

একাত্তরের ২৬ মার্চ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ঢাকায় গণহত্যা শুরু করার পর ২২ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত নোয়াখালী জেলা ছিলো হানাদার মুক্ত। ২২ এপ্রিল বিকেল ৫টায় ৬০-৭০ টি যান্ত্রিক বহর নিয়ে পাকিন্তানী সামরিক কনভয় কুমিল্লা-লাকসাম-সোনাইমুড়ি হয়ে বেগমগঞ্জের মীরওয়ারিশপুর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে চৌরাস্তা অভিমুখে রওয়ানা হয়।ঐ দিনের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সে সময়ের মিরওয়ারিশপুর গ্রামের তরুণ যুবক বর্তমানে আইনজীবী এবিএম ফারুক (৫০) বলেন, "ঐ দিন পাকবাহিনী বেচার দোকান সংলগ্ন আমাদের পৈত্রিক বাড়িতে অবস্থানরত আমার বাবা জনাব ফরিদ মিয়া (টিটি) এবং আমার ভাই মোঃ ফয়েজকে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে। আমি তখন বাড়ির অদূরে লুকিয়ে ঐ হত্যাযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করি। এর পর পাকবাহিনী কালো পুল অভিমুখে রওয়ানা হয়। পুলের সন্নিকটে এসে পাক সামরিক কনভয় থমকে দাঁড়ায়। পাক সামরিক কনভয় আসার আগেই স্থানীয় জনসাধারণ কালো পুল ধ্বংস করে দেয়। এতে উত্তর দক্ষিণের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পাক সামরিক কনভয় চৌরাস্তায় আসার পথে কালো পুলের দক্ষিণ প্রান্তে একটি প্রতিরোধ যুদ্ধের সম্মুখিন হয়। সেই প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেয় শহীদ সালেহ আহম্মদ, জহিরুল ইসলাম, পিন্টু প্রমুখ। ঐ পাক সামরিক শক্তির নিকট পরাভূত হয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ স্তিমিত হলে পাক সামরিক বাহিনী ঝুলন্ত সেতু নির্মান করে সন্ধ্যা নাগাদ কালো পুল অতিক্রম করে বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাই স্কুলে অবস্থান নিয়ে ক্যাম্প স্থাপন করে।"

একাত্তর এর ৯ মাসে অনেক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সেদিনের মিরওয়ারিশপুর গ্রামের কিশোর সারোয়ার আলম (৪৫) জানান, “বেগমগঞ্জ টেকনিক্যাল হাই স্কুলের ক্যাম্পে পাকিন্তানী হানাদার বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার ছিলো মেজর বোখারী। এই ক্যাম্পটি ছিলো পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর নোয়াখালী জেলার মূল ঘাঁটি।“

একাত্তর এর টগবগে যুবক আবদুস সোবাহান বর্তমান বয়স ৬৫ বছর। বাড়ি চৌরাস্তা সংলগ্ন নাজিরপুর গ্রামে। একাত্তরের পুরো নয় মাস আবদুস সোবাহান চৌরাস্তার কালো পুলের পূর্ব পার্শ্বের বেহাল জালে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতো। তখন কালো পুল, কাঠের পুল ছিলো অনেকটাই ভাঙ্গাচোরা। তার পাশেই নির্মিত হয়েছে বর্তমানের পাকা ব্রিজ। আবদুস সোবাহান বলেন, “পাক সামরিক বাহিনী টেকনিক্যাল হাই স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করার পর পরেই মাইজদী থেকে ৫ জন নিরপরাধ স্বাধীনতাকামী বাঙালীকে ধরে এনে কালো পুলের উপরে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। একজন সৌভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে যান। এভাবে পাক হানাদার বাহিনী এ অঞ্চলে নিরপরাধ মানুষ হত্যা শুরু করে।মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসে প্রতিদিন কালো পুলে সর্বনিম্ন ৫/৬ জন ও সর্বোচ্চ ১৫/২০ জন করে মানুষ হত্যা করতো পাকিস্তানী সৈন্যরা। নানা নিষ্ঠুর পন্থায় ওরা হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠতো। নোয়াখালী জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নিরপরাধ মানুষগুলোকে ধরে এনে প্রথমে টেকনিক্যাল হাই স্কুল ক্যাম্পে শারীরিক নির্যাতন করা হোত- তারপর প্রতিদিন সন্ধ্যার পর কালো পুলের উপর দাঁড় করিয়ে বুলেট বেয়নেটে ঝাঁঝরা করা হতো। এভাবেই চলতো স্বাধীনতাকামী নিরপরাধ মানুষদের উপর মানবতাবিরোধী জঘন্য হত্যাযজ্ঞ। বুলেট বেয়নেট এ ঝাঁঝরা হওয়ার পর লাশগুলো ওয়াপদা খালের পানি খুন রাঙা রঙে রাঙিয়ে ভাসতে ভাসতে পশ্চিমে চলে যেতো। এই টেকনিক্যাল হাই স্কুলের ক্যাম্পেই নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় চৌমুহনী কলেজের প্রাক্তন প্রধান করণিক মিরওয়ারিশপুর গ্রামের গুলজার হোসেনকে।“

মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস এভাবেই হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে অবশেষে ডিসেম্বর ৫-৬ তারিখে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী তাদের নিশ্চিত পরাজয় জেনে টেকনিক্যাল হাই স্কুলের ক্যাম্প গুটিয়ে লাকসাম হয়ে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট অভিমুখে চলে যায়। কিন্তু তারা রেখে যায় সেখানে অনেক নৃশংসতার চিহ্ন। বহু নারীর সম্ভ্রম হারানোর অব্যক্ত কান্না। অসংখ্য মৃত-অর্ধমৃত নর নারীর কঙ্কালসার দেহ।




► লেখক: গোলাম আকবর, সদস্য সচিব, নোয়াখালী মানবাধিকার জোট
► নোয়াখালী জেলা প্রশাসন কর্তৃক প্রকাশিত স্মারক স্বাধীনতা ২০০৩ থেকে নেয়া হয়েছে। প্রকাশকালঃ মার্চ ২০০৩।

ফেইসবুকে যোগ করুন

চন্দ্রগঞ্জ ও সোনাইমুড়ির মুক্তিযুদ্ধ - সত্যেন সেন


মুক্তিবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের চর এসে সংবাদ দিল, সামরিক ভ্যান বোঝাই একদল পাকিস্তানি সৈন্যরা ফেনী থেকে চন্দ্রগঞ্জের দিকে আসছে। ওদের যখন চন্দ্রগঞ্জের দিকে চোখ পড়েছে, তখন ওরা সেইখানে লুটপাট না করে ছাড়বেনা। খবর পেয়ে লাফিয়ে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান। বেঙ্গল রেজিমেন্টের লুৎফর রহমান, যিনি এই অঞ্চলে একটি মুক্তিবাহিনী গঠন করেছিলেন। সৈন্যদের সংখ্যা পঞ্চাশ-ষাটজনের মত হবে। এদের প্রতিরোধ করতে হোলে দলে কিছুটা ভারী হয়ে নেওয়া দরকার। খোঁজ-খবর করে অল্প সময়ের মধ্যে মাত্র ছয়জন মুক্তিযোদ্ধাকে জড় করা গেল।

সাতজন মানুষ, সাতটি রাইফেল-এই সামান্য শক্তি নিয়ে ওদের সঙ্গে মোকাবেলা করতে যাওয়াটা ঠিক কি? মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে একজন এই প্রশ্নটা তুলেছিলেন। কথাটা মিথ্যা নয়- এটা একটা দূঃসাহসের কাজ হবে। অথচ হাতে সময় নেই। মুক্তিবাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য যে সময়ের প্রয়োজন, তার মধ্যে এই লুন্ঠনকারী দস্যুরা এদের কাজ হাসিল করে সরে পড়বে। চোখের সামনে এই ঘটনা ঘটে যাবে আর তারা বসে বসে তাই দেখবে। না, কিছুতেই না, গর্জে উঠলেন সুবেদার লুৎফর রহমান, যেভাবেই হোক এদের প্রতিরোধ করতেই হবে। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে ওরা অক্ষতভাবে হাসতে হাসতে চলে যাবে, এ কিছুতেই হতে পারেনা। ওরা আমাদের রক্ত নিয়েছে, তার বিনিময়ে ওদেরও কিছুটা রক্ত দিতে হবে।

রাস্তার ধারে একটা বড় রকমের ইটের পাঁজা। কে যেন কবে একটা দালান তোলবার জন্য এখানে এই ইটগুলি এনে জড় করে রেখেছিলো, অনেকদিন হয়ে গেল, সেই দালান এখনো গাড়ীগুলিকে এই রাস্তা দিয়েই যেতে হবে। সুবেদার লুৎফর রহমান আর ছয়জন মুক্তিযোদ্ধা, সেই ইটের পাঁজার পেছনে পজিশন নিয়ে দাঁড়ালেন। এখান থেকেই তাঁরা সেই হামলাকারী দস্যুদের প্রতিরোধ করবেন, এটা খুবই দূঃসাহসের কাজ তাঁরা জানতেন, তাঁরা তাঁদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে চলেছেন। কিন্তু এমন এক একটা সময় আসে যখন জেনে শুনে বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন। অবস্থা বিশেষ বামন হয়েও তাঁদের দানবের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ করতে হয়। মুক্তিবাহিনীর সুবেদার লুৎফর রহমান বললেন, এখনকার অবস্থা হচ্ছে তেমনি এক অবস্থা। কিন্তু বেশী কথা বলার সময় ছিল না। দূর থেকে অস্ফুট সামরিক ভ্যানের গর্জন শোনা গেলো। ঐ যে, ঐ যে আসছে। ওরা! তাঁরা সাতজন সাতটি রাইফেল নিয়ে তৈরী হয়ে দাঁড়ালেন। সেই অস্ফুট আওয়াজ ক্রমেই স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠতে লাগলো। তারপর একটু বাদেই দেখা গেলো সামরিক ভ্যান পথের ধুলো উড়িয়ে দ্রুতবেগে ছুটে আসছে। উত্তেজিত প্রতীক্ষায় তাঁদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি যেন ইস্পাতের মত দৃঢ় আর কঠিন হয়ে এল।

সামরিক ভ্যান দ্রুত আসতে আসতে হঠাৎ থেমে গেলো। না থেমে উপায় ছিল না, কাদের অদৃশ্য হস্তের গুলিতে গাড়ির টায়ারের চাকা ফুটো হয়ে গেছে। একই সঙ্গে কতগুলি রাইফেলের আওয়াজ। বিস্ময়ে, আতঙ্কে সৈন্যরা ঝুপঝাপ করে গাড়ী থেকে লাফিয়ে রাস্তায় নেমে পড়লো। কিন্তু সেই অদৃশ্য হস্তের গুলিবর্ষণের যেন শেষ নেই। সৈন্যদের মধ্যে যারা সামনের দিকে ছিল, তাদের মধ্যে অনেকে হতাহত হয়ে ভূমিশয্যা নিল। একটু বাদেই রাইফেলের আওয়াজ থেমে গিয়ে পল্লী-প্রকৃতির নিস্তবদ্ধতা আর শান্তি ফিরে এল। সৈন্যরা সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে তন্ন তন্ন করে চারদিক পরীক্ষা করে দেখতে লাগলো। অদৃশ্য শত্রুরা কি তবে ভয় পেয়ে পালিয়ে গিয়েছে? না, ওদের বিশ্বাস নেই, একটু বাদেই হয়তো ওরা আরেক দিক থেকে আক্রমণ করে বসবে। রাস্তার দু'পাশে অনেক ঝোপঝাড় জঙ্গল। তাদের মাঝখানে ওরা কোথায় আশ্রয় নিয়ে বসে আছে কে জানে। তবে দলে ওরা ভারী সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তা না হলে তাদের বিরুদ্ধে এমন করে হামলা করতে সাহস পেত না।

চন্দ্রগঞ্জ সমৃদ্ধ অঞ্চল। এখানে এসে অবাধে লুটপাট করা যাবে, এই আশা নিয়ে তারা এখানে এসেছিল। এই অঞ্চলে তাদের একজন দালাল ছিল। তার কাছ থেকে খবর পেয়েই তারা লুটের আশায় এখানে ছুটে এসেছে। তারা শুনেছিলো এখানে তাদের 'বাধা' দেবার কেউ নেই। কিন্তু হঠাৎ করে কে জানে কোথা থেকে এই শয়তানের দল মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। কে জানে, হয়তো ওরা ইতিমধ্যে তাদের চারিদিক দিয়ে ঘেরাও করে ফেলেছে। প্রতিটি গাছ আর প্রতিটি ঝোপঝাড়ের আড়ালে যে একজন করে শত্রু লুকিয়ে নেই এমন কথাই বা কে বলতে পারে। ওদের রাইফেলগুলি এবার এলোপাথাড়ি ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বর্ষণ করে চলল। এইভাবে বহু গুলি অপচয় করার পর তারা থামল।

কিছু সময় নিঃশব্দে কেটে গেলো। সৈন্যরা ভাবছিল, তাদের অদৃশ্য শত্রুরা সম্ভবত পালিয়ে গেছে। এমন প্রবল গুলি বৃষ্টির মধ্যে ওরা কেমন করে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু তা'হলে যারা হতাহত হয়ে ভুমিশয্যা নিয়েছিলো, ওরা তাদের একজন একজন করে ভ্যানের উপর তুলছিল। ঠিক সে সময়ে আবার কতগুলি রাইফেল এক সঙ্গে গর্জে উঠলো। গুলির পর গুলি আসছে, বিরতি নেই। সৈন্যদের মধ্যে এক অংশ আছে ভ্যানের উপরে, অপর অংশ রাস্তায়। অদৃশ্য হস্তগুলি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এদের লক্ষ্য করে করে গুলি ছুঁড়ছে। একটি গুলিও বৃথা যাচ্ছে না। সৈন্যদের মধ্যে ভীষণ হট্টগোল পড়ে গেল। তারা একটু সামলে নিয়ে আবার প্রবলভাবে গুলি বর্ষণ করে চলল। কিন্তু তাদের সামনে কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। এই ভাবে কিছুক্ষণ দু'পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলল। ইতিমধ্যে সৈন্যদের হতাহতের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলছে। অপর পক্ষে অদৃশ্য প্রতিপক্ষের কি পরিমান ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে তা বোঝার কোন উপায় ছিল না।

অবস্থা দেখে আতঙ্কিত হয়ে উঠল সৈন্যরা। কিন্তু একটু আগে তাদের দালাল সেই লোকটি তাদের সাহায্য করবার জন্য এসে গেছে। সে অত্যন্ত চতুর লোক, চারিদিকে ভাল করে নজর করে সে এই রহস্যটা বুঝতে পারল। দূরবর্তী ইটের পাঁজাটার পেছনে অঙ্গুলী নির্দেশ করে সে বলল, আমার সন্দেহ হয়, ওরা ঐ পাঁজাটির পেছনে দাঁড়িয়ে গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। ঠিক কথাইতো, এই সন্দেহটা সকলের মনেই জাগা উচিৎ ছিলো। কিন্তু এতক্ষণ এই কথাটা ওদের কারও মাথায় আসেনি।

এবার ওদের রাইফেলগুলি একেবারে নিঃশব্দ হয়ে গেল। সৈন্যরা তিনভাগে ভাগ হয়ে অতি সন্তর্পণে তিনদিক দিয়ে এগিয়ে চলল। ইটের স্তুপটাকে ঘেরাও করে ফেলতে হবে। খুব সাবধান, ওদের একটাও যেন সরে পড়তে না পারে।
মুক্তিবাহিনীর জওয়ানরা ইটের পাঁজার আড়াল থেকে সবকিছুই দেখছিল। সৈন্যদের মতলব বুঝতে তাদের বাকী রইলো না।
আর এক মুহূর্ত দেরী করার সময় নেই। এখনই তাদের সরে পড়তে হবে। এই সংঘর্ষের মধ্যে দিয়ে তারা যতটা আশা করেছিল, তারচেয়ে অনেক বেশী কাজ হাসিল করতে পেরেছে। এবার তারা স্বচ্ছন্দে ছুটি নিতে পারে। একজন একজন করে সাতজন মুক্তিযোদ্ধা ওদের দৃষ্টি এড়িয়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার কিছুটা বাদে শিকার সন্ধানী সৈন্যরা এসে সাফল্যের সঙ্গে সেই ইটের স্তুপটাকে ঘেরাও করে ফেলল। কিন্তু কি দেখল এসে? দেখল, পাখিগুলি তাদের একদম বোকা বানিয়ে দিয়ে মুক্ত আকাশে উড়ে চলে গিয়েছে। ইটের পাঁজার পেছনে একই জনপ্রাণী নেই। শুধু মাটির উপরে অনেকগুলি কার্তুজের খোল ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে পড়ে আছে।

সেদিনকার যুদ্ধে সবসুদ্ধ ২৩ জন সৈন্য হতাহত হয়েছিল। আর মুক্তিবাহিনীর সাতটি জওয়ান সম্পর্ণ অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পেরেছিল। যে দেশদ্রোহী দালালটি শত্রুদের সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এসেছিল, এর কয়েকদিন বাদেই মুক্তিযোদ্ধারা তাকে খতম করল।

সেইদিন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে ঘা খেয়ে পাক সৈন্যদের চূড়ান্তভাবে নাকাল হতে হয়েছিল। চন্দ্রগঞ্জে লুটপাট করা দূরে থাক, হতাহত বন্ধুদের নিয়ে গাড়ী বোঝাই করে ওরা মাথা হেঁট করে ফিরে এসেছিল। কিন্তু এই অপমান আর লাঞ্ছনা ওরা ভুলে যেতে পারেনি। দিন কয়েক বাদে ওরা আবার নতুনভাবে তৈরী হয়ে চলল চন্দ্রগঞ্জের দিকে। তাদের মনের জ্বালাটা এবার ভাল করেই মিটিয়ে নেবে।
পাক-সৈন্যরা আবার হামলা করতে আসছে। এই খবরটা পৌছে গিয়েছিল চন্দ্রগঞ্জে। সুবেদার লুৎফর রহমান এখন সেইখানে নেই, অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যেও কেউ নেই। এবার কে তাদের প্রতিরোধ করবে? ওরা সেদিন আচ্ছামত ঘা খেয়ে ঘরে ফিরে গেছে, এবার ভাল করেই তার প্রতিশোধ তুলবে। চন্দ্রগঞ্জকে এবার ওরা ধ্বংসস্তুপে পরিণত না করে ছাড়বেনা। যাকে পাবে তাকেই মারবে। ওদের হাতে কেউ কি রেহাই পাবে? সারা অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। চন্দ্রগঞ্জের মানুষ ঘর-বাড়ী ছেড়ে পালাতে লাগল। ওরা ওদের যা করবার বিনা বাধায় করে যাবে। কিন্তু চন্দ্রগঞ্জের একটি মানুষ এই কথাটাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না। মাত্র সেদিন এই চন্দ্রগঞ্জের বুকে ৭ জন মুক্তযোদ্ধা বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ দিয়ে দুর্দ্দান্ত পাক-সৈন্যদের দুর্দশার চূড়ান্ত করে ছেড়ে দিয়েছে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই অঞ্চলেরই মানুষ, এই মাটিতেই মানুষ হয়ে উঠছে। এখানকার মানুষ, শুধু এখানকার নয়, সারা নোয়াখালী জিলার মানুষ তাদের জন্য গৌরববোধ করে। রাস্তার ধারে সেই ইটের স্তুপটি এখনও সেই যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ রুপে বিরাজ করছে। এর মধ্যে তার কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? আজ মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে কেউ এখানে নেই বলে ওরা অবাধে যা খুশি তাই করে চলে যাবে। না, কিছুতেই না, গর্জে উঠলেন তিনি, এ আমি কিছুতেই হতে দেবো না। আর যদি কেউ না যায়, আমি একাই যাবো, একাই গিয়ে ওদের সঙ্গে লড়াই করবো।

কে এই লোকটি? কি তাঁর নাম? না, তার নাম আমার জানা নেই। কোন খ্যাতনামা লোক নন তিনি। একজন প্রাক্তন সৈনিক। আর দশজন বৃদ্ধের মত তিনিও তাঁর জীবনের শেষদিনগুলি ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করে কাটিয়ে যাচ্ছিলেন। একজন সাধারণ মানুষ। কেউ কোনদিন তাঁর কোন অসাধারণত্বের পরিচয় পাননি। কিন্তু আজ দেশের এক বিশেষ অবস্থায় একটি বিশেষ অনুকূল মুহূর্ত তাঁর ভেতরকার সুপ্ত আগুনকে জাগিয়ে তুলেছে। যেখানে হাজার হাজার মানুষ ভয়ে অস্থির, সেখানে এই একটি মানুষ দৃঢ় নিষ্কম্প কন্ঠে ঘোষণা করলেন, যদি একা যেতে হয়, আমি একাই যাবো, আমি একাই ওদের সঙ্গে লড়াই করব। মরবার আগে এই হিংস্র পশুগুলির মধ্যে একটাকেও যদি মেরে যেতে পারি, তবে আমার জীবন সার্থক হবে।

যারা তার হিতৈষী, তারা তাঁকে নিবৃত্ত করবার জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিল। বলেছিল. তুমি একা মানুষ, তার উপর বুড়ো হয়েছ। তুমি কি করে ওদের সঙ্গে লড়াই করবে? কিন্তু কারও কোন বাধা তিনি মানলেন না, দৃঢ়-মুষ্টিতে রাইফেলটা আঁকড়ে ধরে বেরিয়ে পড়লেন ঘর থেকে। তাঁর এই দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর তরুণ ছেলে তাঁকে ডেকে বলল, দাঁড়াও আব্বা, আমিও তোমার সঙ্গে যাব। তোমার মত আমিও ওদের সঙ্গে লড়াই করব। ছেলের কথা শুনে বাপের মুখ আনন্দে উজ্জল হয়ে উঠল। দু’জনের হাতে দুটি রাইফেল, পিতা-পুত্র পাশাপাশি প্রতিরোধ সংগ্রামে যাত্রা করল।
আজও ওরা সেই ইটের পাঁজার পেছনে আশ্রয় নিল। ওরা পিতা-পুত্র পাশাপাশি বসে শত্রুদের আগমনের জন্য অধীর চিত্তে প্রতীক্ষা করতে লাগল। কিছুক্ষণ বাদের দূর থেকে মোটর ভ্যানের গর্জন শোনা গেল। হ্যাঁ ওরা আসছে। দেখতে দেখতে সৈন্যবাহী গাড়ী একেবারেই কাছে এসে পড়ল। সৈন্যদের মধ্যে অনেকের কাছেই ইটের পাঁজাটি সুপরিচিত। ঐটিকে ভুলে যাওয়া তাদের পক্ষে কোন মতেই সম্ভব নয়, কিন্তু আজও যে কেউ তাদের আক্রমণ করার জন্য এর আড়ালে ওত পেতে বসে থাকতে পারে, এটা তারা ভাবতে পারেনি। ভাবতে না পারা অস্বাভাবিকও নয়। কিন্তু ওরা এই স্তুপটার বরাবর আসতেই পরপর তিনজন সৈন্য গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ে গেল। সবাই দেখতে পেল, কে বা কারা তাদের লক্ষ্য করে স্তুপটার আড়াল থেকে গুলিবর্ষণ করে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গেই সৈন্যরা এর পাল্টা জবাব দিল। ইটের পাঁজাটাকে লক্ষ্য করে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি বর্ষণ চলল। এরপর সেই স্তুপের পেছন থেকে আর কোন গুলির শব্দ শোনা গেল না। সৈন্যরা একটু সময় অপেক্ষা করল, তারপর ছুটে গেল স্তুপটার সামনে। উদ্যত রাইফেল বাগিয়ে ধরে যখন তারা পায়ে পায়ে সেই স্তুপটার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল, তখন দেখতে পেল, সেইখানে এক বৃদ্ধের রক্তাক্ত মৃতদেহ পড়ে আছে।
কিন্তু অস্ত্র বলতে কোন কিছু সেখানে নাই, শুধু কয়েকটা কার্তুজের খোল পড়ে আছে।ওরা বুঝল, এই বৃদ্ধের সঙ্গে আরও যারা ছিল তারা অস্ত্রসহ পালিয়ে গিয়েছে। আমি ভাবছি, যেদিন বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হবে, স্বাধীন হবে, সে দিন পবিত্র এই জায়গাটিতে সেই গৌরবময় প্রতিরোধ সংগ্রামের স্মারক হিসাবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ কি গড়ে উঠবে? চন্দ্রগঞ্জের যুদ্ধের পর সুবেদার লুৎফর রহমান নোয়াখালীর বিভিন্ন অঞ্চলে শিকারের সন্ধানে ছুটে চলছিলেন। তাঁর এক মুহূর্তও বিশ্রামের অবকাশ নেই। তিনি পাক সৈন্যদের গতিবিধি সম্পর্কে দক্ষ শিকারীর মত তীক্ষ্ণ সন্ধানী দৃষ্টি নিয়ে ফিরছিলেন। মুক্তিবাহিনীর গুপ্তচরেরা নিত্য নতুন সংবাদ নিয়ে আসছে। আর সেই সূত্র অনুসরণ করে তাদের মুক্তিবাহিনী যেখানেই সুযোগ পাচ্ছে, সেখানেই শত্রুদের উপর ঘা দিয়ে চলেছে।

আঘাতের পর আঘাত হানো কখনও ডাইনে কখনও বাঁয়ে, কখনও সামনে থেকে, কখনও বা পেছন থেকে। ওদের অস্থির আর পাগল করে তোল। ওদের কোন সময় স্বস্তিতে বা শান্তিতে থাকতে দিও না, ওদের প্রতিটি মুহূর্ত দূরভাবনায় কাটুক। ওরা যেন ঘুমের মধ্যেও দূ‍স্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠে। মুক্তিবাহিনী এই নীতি অনুসরণ করেই কাজ করে চলছিল।ওরা হামলাকারীদের নিশ্চিত মনে বিশ্রাম করতে দেবেনা, নিজেরাও বিশ্রাম নেবেনা।

এপ্রিলের শেষভাগ। খবর এল, একদল সৈন্য কুমিল্লার লাকসাম থেকে ট্রেনে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি স্টেশনে এসে পৌঁছুবে। লুতফর রহমান এই খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তাঁর সহকর্মীদের সঙ্গে পরামর্শ করতে বসলেন। স্থির হোল, ওদের বিনা বাধায় এগোতে দেওয়া হবেনা, সোনাইমুড়ি স্টেশনেই এই হামলাকারীদের উপর হামলা করতে হবে। রেলস্টেশনে চড়াও হয়ে আক্রমণ। হয়তো সেজন্য মুক্তিবাহিনীকে বেশ কিছুটা মূল্য দিতে হবে, অনেক ক্ষয়ক্ষতি বরণ করে নিতে হবে। তা হোক, এই শিকারকে কিছুতেই ফসকে যেতে দেওয়া চলবে না।

কিন্তু এবার আর চন্দ্রগঞ্জের মত সাতজন মুক্তিযোদ্ধা দিয়ে চলবেনা। এবার আর আগেকার মত আড়াল থেকে যুদ্ধ নয়, যুদ্ধ চলবে প্রকাশ্য, মুখোমুখি। ওদের সৈন্য সংখ্যা বড় কম নয়, আক্রমণ করতে হলে বেশ কিছুটা শক্তি সংগ্রহ করে নিতে হবে। সেই অল্প সময়ের মধ্যেই পঞ্চাশজন সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাকে সোনাইমুড়িতে এনে জড় করা গেল। অবশ্য যতদূর জানা গিয়েছে সৈন্যদের সংখ্যা এরচেয়েও অনেকটা বেশী, তা হোক, এই শক্তি নিয়েই ওদের সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে।

নির্দিষ্ট সময়ে সৈন্যবাহী ট্রেনটা সোনাইমুড়ি স্টেশনে এসে পৌছল। মুক্তিবাহিনী কাছেই কোন একটা জায়গায় লুকিয়ে ছিল। ট্রেনটা এসে পৌছাবার সাথে সাথেই রাইফেলধারী মুক্তিযোদ্ধারা বিদ্যূতগতিতে ছুটে এসে ট্রেনটাকে ঘেরাও করে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে তারা ট্রেনের আরোহীদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে লাগল। ওরা গাড়ীর ইঞ্জিনটাকেও লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ছিল। ড্রাইভারহীন ট্রেনটা অচল হয়ে গেল।

প্রকাশ্য দিবালোকে এইভাবে আক্রান্ত হতে হবে, পাক সৈন্যরা তা কল্পনাও করতে পারেনি। তারপর ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটে গেল যে, একটু সময় ওরা হতভম্ব আর স্তব্ধ হয়ে রইল। পর মুহূর্তেই তারা তাদের রাইফেল বাগিয়ে ধরে হুড়মুড় করে কামরা থেকে প্লাটফর্মের উপর নেমে পড়তে লাগল। ওদের মধ্যে কয়েকজনকে কামরা থেকে নামবার আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে প্রাণ দিতে হল।

এবার দু’পক্ষে শুরু হয়ে গেল যুদ্ধ। এবারকার বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে রেলস্টেশনের উপর এ ধরনের লড়াই আর কোথাও ঘটেছে বলে শোনা যায়নি। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি রেলস্টেশন এজন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে। প্রায় তিনঘন্টা ধরে এ লড়াই চলল। এই যুদ্ধে পঁয়ত্রিশজনের মত পাক সৈন্য নিহত হয়েছিল।মুক্তিযোদ্ধাদের ছয়জন শহীদ হলেন। ইতিমধ্যে খবরটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। খবর পেয়ে ঘন্টাতিনেক বাদে আক্রান্ত পাক-সৈন্যদের সাহায্য করার জন্য চৌমুহনী থেকে সামরিক ভ্যানে করে একদল সৈন্য ঘটনাস্থলে এসে পৌছল। এবার পাক সৈন্যদের মোট সংখ্যা দাঁড়াল আড়াইশতের উপরে। হতাহতের বাদ দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা তখন আনুমানিক চল্লিশ এ এসে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়াটা নির্বুদ্ধিতার নামান্তর মাত্র। মুক্তিযোদ্ধারা এমন ভুল কখনও করেনা। তারা যেমন বিদ্যূৎগতিতে এসে আক্রমণ করেছিল, তেমনিভাবেই ঘটনাস্থল থেকেই অদৃশ্য হয়ে গেল। পাকিস্তানী সৈন্যরা তাদের পেছন পেছন ধাওয়া করে আক্রমণ করতে চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের সে চেষ্টা ব্যর্থ হল।

।।শেষ।।



রবিউল হোসেন কচি সম্পাদিত নোয়াখালী পৌরসভা কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক স্মারকগ্রন্থ “নোয়াখালী” থেকে নেয়া হয়েছে। প্রকাশকালঃ ২ জুলাই ১৯৯৮

ফেইসবুকে যোগ করুন

মঙ্গলবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০০৭

নোয়াখালী পৌর এলাকার প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা



► জনাব আবদুল মালেক উকিল
► জনাব সহিদ উদ্দিন ইস্কেন্দার
► জনাব মাহমুদুর রহমান বেলায়েত
► জনাব অহিদুর রহমান অদু (শহীদ)
► জনাব অধ্যাপক মোঃ হানিফ
► জনাব মমিন উল্যাহ এডভোকেট
► জনাব ফজলে এলাহি
► জনাব সাহাবুদ্দিন ইস্কেন্দার (শহীদ)
► জনাব রবিউল হোসেন কচি
► জনাব মোঃ বাচ্চু মিয়া (শহীদ)
► জনাব রফিক উল্যাহ
► জনাব আবদুর রব বাবু (শহীদ)
► জনাব মিজানুর রহমান
► জনাব সাইফুল আলম জাহাঙ্গীর
► জনাব মোশারফ হোসেন
► জনাব মোজাম্মেল হক মিলন
► জনাব সফিকুর রহমান
► জনাব আবদুল গোফরান (শহীদ)
► জনাব জয়নাল আবেদীন
► জনাব আবদুর রব
► জনাব আজিজুর রহমান
► জনাব কামাল উদ্দিন আহম্মদ
► জনাব মোস্তাফিজুর রহমান লুতু
► জনাব কাজী সোলেমান
► জনাব লুৎফুর রহমান
► জনাব ফজলুল কবির
► জনাব মমতাজুল করিম বাচ্চু
► জনাব মাহমুদুর রহমান
► জনাব কামাল উদ্দিন
► জনাব সামছুদ্দিন
► জনাব ইউছুফ আলী
► জনাব মোফাজ্জল হোসেন চুন্নু
► জনাব মোস্তফা কামাল
► জনাব আবুল খায়ের
► জনাব আবদুল মালেক
► জনাব জবিউল হোসেন বাহার
► শ্রী প্রণব ভট্ট
► শ্রী পরিমল চন্দ্র পল্টু
► শ্রী জীবন দাস
► শ্রী নিত্য গোপাল দেবনান্দ্র
► জনাব মোঃ হানিফ
► জনাব সেলিম মোঃ মোহসিন আলী
► জনাব সেকান্দর মিয়া
► জনাব আবদুল খালেক
► জনাব ফরিদ মিয়া
► জনাব মোঃ মমিন উল্যা
► জনাব সফি উদ্দিন চুন্নু
► জনাব আবদুল হাই
► জনাব ইঞ্জিঃ আবদুল গোফরান
► জনাব সারওয়ার-ই-দ্বীন এডভোকেট
► জনাব মোস্তফা কামাল
► জনাব আবুল কাশেম
► জনাব আবুল কালাম আজাদ
► জনাব আজিজুর রহমান ইকবাল
► জনাব আইয়ুব আলী
► জনাব রেজাউল করিম বাহাদুর
► জনাব এমরান মোঃ আলী
► জনাব আতিকুর রহমান (নৌ)
► জনাব আবদুর রাজ্জাক (নৌ)
► জনাব আবদুল ওদুদ
► জনাব গোলাম মহিউদ্দিন লাতু
► জনাব গোলাম রাব্বানি
► জনাব মোজাম্মেল হক মঞ্জু
► জনাব তাজুল ইসলাম
► জনাব মোঃ সেলিম
► জনাব খোন্দকার আবদুল আজিজ
► জনাব নূর আলম
► জনাব রফিকুল ইসলাম
► জনাব আবদুল জলিল
► জনাব এ.বি.এস ফজলুল হক বাদল
► জনাব মাইনুদ্দিন জাহাঙ্গীর
► জনাব মজিবুল হক
► জনাব আবদুল মান্নান
► জনাব মোজাম্মেল হক মঞ্জু
► জনাব সাকিল মোঃ পারভেজ
► জনাব রশিদ উদ্দিন শাহনাজ
► জনাব জসিম উদ্দিন (শহীদ)
► জনাব মেসবাহ উদ্দিন (শহীদ)
► জনাব রুহুল আমিন
► জনাব সিরাজ উদ্দিন আহম্মদ
► জনাব সলিমউল্যা
► জনাব মোঃ ননী মিয়া
► জনাব লুৎফর রহমান লুতু
► জনাব শাহ্‌আলম (শহীদ)
► শ্রী সত্য নারায়ন দাস (সেন্টু)
► জনাব ফজলুর রহমান
► জনাব আমিনুর রসুল
► জনাব নূর মোহাম্মদ
► জনাব গোলাম মোস্তফা
► জনাব আবদুল ওহাব
► জনাব মোজাম্মেল হোসেন (শহীদ)
► জনাব দুলাল মিয়া


*তথ্য সংগ্রহঃ কামালউদ্দিন- সদর থানা কমান্ডার

**সংকলনটি রবিউল হোসেন কচি সম্পাদিত নোয়াখালী পৌরসভা কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক স্মারকগ্রন্থ “নোয়াখালী” থেকে নেয়া হয়েছে। প্রকাশকালঃ ২ জুলাই ১৯৯৮

ফেইসবুকে যোগ করুন

মঙ্গলবার, ৬ নভেম্বর, ২০০৭

শ্রীপুরের গণহত্যা


সোনাপুর নোয়াখালী পৌরসভার সর্বদক্ষিণের একটি ছোট গ্রাম। এর চারপাশে মহব্বতপুর, শ্রীপুর, জালিয়াল, করিমপুর, গোপাই ও পশ্চিম বদরীপুর। কবি বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতি বিজড়িত নোয়াখালী শহরটি এর দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে ছি‍ল একদা। পাকিস্তানী স্বৈরশাসনের গোটা সময়টা সোনাপুর ছিলো নোয়াখালীর প্রাণকেন্দ্র।এখানে জেনারেল আইয়ুবের প্রতি বিক্ষোভ হয়েছে, মেজর জেনারেল আজম খানের প্রতি ‘ফিরে যাও’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়েছে, পাকিস্তানি জান্তার দালাল ফ.কা চৌধুরীর প্রতি ঘৃণামিশ্রিত কালো পতাকা উথ্বিত হয়েছে। সৈরশাসকের দোসর এখানে জনগণের সম্মানসূচক রায় পায়নি। ২৩ মার্চ ১৯৭১ সনের পরবর্তী প্রথম দশ দিনের মধ্যে অপরিণত মুক্তিযোদ্ধাদের দল সংগঠিত হয়েছে। স্থানীয় মিশনারী উচ্চ বিদ্যালয়ে বোমা বানাতে গিয়ে পশ্চিম বদরীপুর গ্রামের কৃতিসন্তান বাহারুল আলম চৌধুরী আহত হয়েছেন। পরবর্তীকালে আহত অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে এই সোনাপুর এলাকার আধ কিলোমিটার দূরত্বে স্বাধীনতার পর প্রতিষ্ঠিত হয় একটি হিন্দু সাধুর আখড়া ও একটি খ্রীস্টানদের গীর্জা। ৪০০ বর্গ কিমি বিন্যস্ত বিশাল চরের পশ্চাতে শান্তিপূর্ণ জনপদ বেষ্টিত সোনাপুর বাজার ও সংলগ্ন শ্রীপুর গ্রামের উপর পাকিস্তানি আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ এক বিরল নিষ্ঠুর গণহত্যা।

ইসলামপ্রীতির কথা বাদ দিলেও পাকিস্তানিদের একটা অহমিকা ছিলো তাদের সৈন্যবাহিনীর ক্ষমতা ও যোগ্যতা নিয়ে। ১৮ জুন ১৯৭১ সালের বিকেল ৪টা থেকে ৬টা পর্যন্ত নারকীয় হত্যাযজ্ঞের কারণ কি এবং স্বাধীনতাযুদ্ধের সাথে এই ধ্বংসযজ্ঞের সম্পর্ক কোথায়- তা নির্ণয় করা কঠিন। জাতিসংঘের সদস্যপদপ্রাপ্ত ইসলাম রক্ষার সংগঠন পাকিস্তানের নিয়মিত সৈন্য‍বাহিনী নি:সন্দেহে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর ভিতর দিয়ে গড়ে উঠেছে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ক্ষমতাকে করেছে সুসংগঠিত। এরকম অহমিকায় প্রদীপ্ত দেশের সৈন্যবাহিনীর আচরণ ও শিক্ষার বাস্তব প্রকাশ ভাবার বিষয়। যে কোন রাষ্ট্রের নিজস্ব সংগঠন তার সৈন্যবাহিনী। হত্যা, ধ্বংস, আক্রমণ বা প্রতিরোধ যে কোন কাজেই তার উদ্দেশ্য থাকে। কারণহীন সামরিক এ্যাকশন সৈন্য, রাষ্ট্র ও রাষ্ট্র পরিচালকদের ব্যাপারে ভীতির সঞ্চার করা ছাড়া আর কোন অর্থ বহন করে না।সময়ে ভাড়াটিয়া বুদ্ধি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পোষাকি মানবপ্রীতি, তথাকথিত মুসলিম দেশ পাকিস্তানের প্রতি মমতাবোধ ও ইসলামদরদী সেজে সাধারণ মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখতে পারলেও ওদের আসল চরিত্র উন্মোচিত হতে সময় নেয়নি। অকারণে গণহত্যা, সম্পদ লুন্ঠন ও গণতন্ত্র হত্যার কাজে পাকিস্তানি শাসক মহলের জুড়ি নেই। আজ স্মৃতিরোমন্থন করে শিহরিত হচ্ছি- কেমন করে প্রতারক শোষকশ্রেণীর খপ্পরে ছিল বাংলার মেহনতী সাধারণ মানুষ চব্বিশটি বছর।


এপ্রিলে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনীর হাতে শহর পতনের পর থিতিয়ে আসছিলো উত্তেজনা। নোয়াখালী শহরে জেঁকে বসে গেছে মুসলিম লীগ ও জামাতের পাকিস্তানি দালালদের প্রশাসন। গঠিত হয় শান্তি কমিটি, ঘাপটি মারা নিরীহ সেজে থাকা পাকিস্তানি দোসররা বাঘ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে স্বাধীনতাকামী জনসাধারণের উপর। ঘর-বাড়ী, দোকান-পাট লুট হয়ে ছারখার। শহরের হিন্দু বসতি প্রায় নিশ্চিহ্ন। সোনাপুর এলাকার খ্রীস্টান জনগোষ্ঠী নিশ্চিত কোনপক্ষই তাদের প্রতি বিরাগ হতে পারবে না। তারা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পক্ষে নানা সাহায্য সহানুভূতিতে আগুয়ান।


তখনকার নোয়াখালীর চালচিত্র অনেকটা শোকাহত মায়ের শোক সামলে ওঠার পর ধীর মন্থর গতিতে সংসারের হা‍ল ধরার মত অবস্থা।স্বাধীনতার দীপ্তি আগুনের মতো বাংলা প্রেমিকদের হৃদয়ে জ্বলছে। অসহায় মানুষেরা প্রত্যক্ষ করছে রাজাকার, মুসলিম লীগ, আর জামাতিদের জঘন্যতম কাজগুলো। মনে পড়ে এক হিন্দুর বাসা দখলের পর টাইটেল পাস জামাতের শহর নেতা স্বহস্তে গাছ কেটে সাফ করে ফেলছেন। বিস্ময়াভিভূত দর্শকের জিজ্ঞাসা, “গাছের কি দোষ”? ইসলামপন্থী মাওলানার সংক্ষিপ্ত জবাব- “হিন্দুর চিহ্ন ও রাখবো না, হিন্দু কাফের, হিন্দুর ফুল ও কাফের”।এই ছিলো পাকিস্তানিপ্রেমীদের মানসিকতা। শোনা যায় এই মাওলানা এখনও রাজনীতি করেন। এখনও বাংলাদেশে ইসলাম কায়েমের স্বপ্ন দেখেন। আরেক কোরআনে হাফেজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা নিধনের অজুহাতে খলিফারহাট এলাকায় তিনমাসের প্রসূতি মহিলাকে গণধর্ষণের পর তার গোপন অঙ্গে লবণ-মরিচ মেখে দিয়ে বীরের মতো যুদ্ধ জয় করে পাষন্ডরা। নাদির শাহীর কায়দায় লুন্ঠিত দ্রব্য এরা পরস্পরের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করত। এ সবই পাকিস্তানের বজায় রাখার লড়াইয়ের ইতিহাস। ইসলামের মহত্ত্বকে কালিমা লিপ্ত করার জন্য ধর্মব্যবসায়ী ও ক্ষমতালিপ্সু পিশাচেরা দায়ী। মুসলমান ও ইসলাম কখনও মানুষের মঙ্গল ছাড়া ক্ষতির চিন্তা করে না। কোন অত্যাচারী জুলুমবাজ শোষকের সাথে অন্তত আর যাই হোক মুসলমানদের সম্পর্ক থাকতে পারে না।


সোনাপুর নামের অবতারণা দিয়ে এই টুকরো কথা লেখা শুরু করেছিলাম। সোনাপুরে সংগঠিত পাকিস্তানি সৈন্যদের নিরর্থক হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা কোথাও বিবৃত হয়নি। আগেই বলা হয়েছে বাংলার দক্ষিণে রেল আর পাকা সড়কের থমকে যাওয়া জনপদ ‘সোনাপুর’ সাহসী মানুষের সুখী ও অসাম্প্রদায়িক জীবন আর চিরদরিদ্র খেটে খাওয়া জনস্রোতের এক আশ্চর্য আশ্রয়। মাত্র এক বর্গকিলোমিটার এলাকাকে রিক্সার চারণভূমি বলা যাবে। মসজিদ মাদ্রাসার পীঠস্থান বলা যাবে। হিন্দু-খ্রীস্টানের মিলনস্থান বলা যাবে, আর বলা যাবে শিক্ষার কেন্দ্রভূমি।১৯৭১ সালের ১৮ জুন। মাত্র ৪০০ গজ রাস্তার দুই ধারে ‘টি’ অক্ষরের মত সাজানো ছোট ছোট দোকানের পসরা বসেছে। একপাশে অলসভাবে শুয়ে থাকা লাল রেলস্টেশন ঘর, তারের পুকুর, বকশির মসজিদ, দরিদ্রতম মানুষের গায়ে লাগা ঘরের চরিলাই, রসিদ হিমাগার, কয়হাত পরেই বেড়ী বাঁধের কোলঘেঁষে নেমে গেছে দক্ষিণে বহুদূরে জেগে ওঠা চরের সমারোহ।সুপারি চারা, নারিকেল ও কলার পাতার আড়ে ছোট ছোট ঘরের বিরল বসত। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে, দুপুরের ঘুম স্তব্ধতা ভেঙ্গে চা-দোকানের কোলাহল- বিকাল নামছে ধীরে ধীরে। মসজিদ-মাদ্রাসার আজান আর বৈকালিক ট্রেনের শব্দে জেগে উঠছে মহব্বতপুর, শ্রীপুর, পশ্চিম বদরীপুর আর করিমপুর।


বেলা চারটায় উত্তরের পাকাসড়ক ধরে ছুটে এল শব্দময় দানব বাস, ট্রাক, লরি। স্থানে স্থানে উগরে দিলো চাইনিজ অটোমেটিক হাতে পাকিস্তানি সেনাদের। সর্বদক্ষিণে ছুটে এসে একটি বাস থাম‌লো। ‘টি’ –এর পশ্চিম বাহুতে ছুটে গেলো একদল। উত্তর দিকের শ্রীপুর ও করিমপুর গ্রামে ঢুকলো একদল সেনা। মোক্তারবাড়ীর চারপাশ ঘিরে ঘনবসতির ঘেরে ঢুকে গেলো পাকিস্তানি হানাদাররা। উত্তর সোনাপুর এলাকায় আগেই নেমে পড়েছিলো একদল। পাকিস্তানি সেনাদলের কোন ঘোষণা নেই, অনুসন্ধান তত্পরতা নেই, নেই কোন প্রতিরোধের প্রতীক্ষা।‘টি’ –এর পশ্চিমপ্রান্ত থেকে প্রথমগুলির সংকেত পাওয়া গেলো। সন্ত্রস্ত ভীত দোকানে বসে-দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, অসহায় ছোটাছুটি, নির্বিচারে লুট করছে।গুলি করছে আগুন লাগাচ্ছে তারা। মুহুর্তে চার’শ গজ এলাকা নরকে পরিণত হলো। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল আগুন, জ্বেলে গেল দোকান, ঘর-বাড়ী, খুন হয়ে গেলো শতাধিক জন মানুষ।পুড়ে ছাই হয়ে গেলো অনেকেই দু’ঘন্টা সময়ের মধ্যে প্রতিবাদ প্রতিরোধহীন সোনাপুর আর তার চারপাশের গ্রামে নেমে এল এক শ্মশানের নিস্তব্ধতা।দোকানে লাশ, দোকানের সামনে লাশ, ডাক্তার, ডাক্তারের কাছে আসা রোগী, শিশু, যুবক, বৃদ্ধ কোন স্তরের মানুষই বেঁচে থাকার আকুতি ছাড়া পাকিস্তানি বীর সৈনিকরা কোন প্রতিরোধের সম্মখীন হয়নি। মুক্তিযোদ্ধার হাতিয়ার দুরে থাকুক, চোর তাড়ানোর একটি লাঠি, বল্লম ও তাদের চোখে পড়েনি। তবুও তাদের জিঘাংসার আগুনে প্রাণ দিয়েছে এক’শ চব্বিশ জন মুসলমান ও এক জন মুচি। রিক্সাচালক, মুটে মজুরের মা-বোনের ইজ্জত লুন্ঠিত হয়েছে অগণিত। প্রবীণা, যুবতী পর্দানশিন নারীর ঘোমটা উন্মোচিত হয়েছে পাকিস্তানি বর্বরদের কামনিষ্ঠুর ভয়ালথাবায়। এই অপমানের কথা কেউ কোনদিন জানবেনা। এই নিষ্ঠুর হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠনের ক্ষত কেবল তীব্র ঘ্রণা হয়ে জেগে আছে সেদিনের প্রত্যক্ষদর্শীদের মনে। বহু ছোট ব্যবসায়ী দোকান হারিয়ে চিরদিনের জন্য দরিদ্র হয়ে গেছে স্বাধীনতা পরবর্তী পুনর্বাসন তাদের জীবনে আর্থিক স্বস্তি আর ফিরিয়ে দিতে পারেনি কোনদিন। দু’শ পঁচিশটি ছোট-বড় দোকানে লুন্ঠন চালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে। পাঁচশটি পরিবারের প্রতিটি ঘরে ঢুকেছে হানাদার। এ লুন্ঠন, ধর্ষণ আর পালিয়ে যেতে না পারা মানুষদের হত্যা, প্রতিটি পরিবারে এনেছে শোকের করুণ ছায়া। পাকিস্তানি সৈন্যদের অবস্থান ছিলো দু ঘন্টা পনের মিনিট মাত্র। বর্বরতার নিদারুণ লজ্জ্বা এদের স্পর্শ করেনি। ঝড়ের বেগে এসে ঝড়ের বেগে নিরাপদে ফিরেছে, বিশ্ববেহায়া নির্লজ্জ বীরপুঙ্গবেরা। পাকিস্তানি লীগ-জামাতের সেদিনের সাথীরা মানুষের দুর্দশায় হেসে বিজয়ীর বেশে কোলাকুলি করেছে। সৈন্যবাহিনীর যে কোন “এজেল্ট” এ অন্তত শত্রুবাহিনীর কোন না কোন তত্পরতার নমুনা থাকে।সোনাপুর অপারেশন ছিলো ঠান্ডা মাথার হত্যাযজ্ঞ। নিরীহ মানুষের রক্তে হোলিখেলার উত্সব। দেশরক্ষা ও ইসলামের নামে ক্ষমতার মসনদে বসে থাকা পাকিস্তানি হায়েনা ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের নিষ্ঠুর হোলিখেলার জবাব একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা দিয়েছে। কিন্তু ধর্মের নামে এ ধরনের নিষ্ঠুরতার অবসান কি হয়েছে এদেশে?



* লেখকঃ ত. ম ফারুক
প্রকাশকালঃ ২ জুলাই ১৯৯৮

** লেখাটি রবিউল হোসেন কচি সম্পাদিত নোয়াখালী পৌরসভা কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক স্মারকগ্রন্থ “নোয়াখালী” থেকে নেয়া হয়েছে।

ফেইসবুকে যোগ করুন

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০০৭

গোপালপুরে গণহত্যা

নোয়াখালী জেলার বেগমগঞ্জ থানা সদর থেকে আনুমানিক নয় কিলোমিটার পশ্চিম-উত্তর দিকে গোপালপুর বাজারের অবস্থান। এরই পশ্চিমপার্শ্বে কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে গোপালপুর মির্জানগর পরগণার এক সময়ের প্রভাবশালী জমিদার বাড়ী। এছাড়া বাজারের কোলঘেঁষে গোপালপুর আলী হায়দার উচ্চ বিদ্যালয়। পশ্চিম-উত্তর মাথায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ব্যাংক ও পোস্ট অফিস।

মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে অসহযোগ আন্দোলনে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা আবু কায়েস মাহমুদ, মোঃ মোহসীন দুলাল, জাকির হোসেন, মাহমুদুল হোসেন চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এ এলাকার বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ আনিছুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা নিম চন্দ্র ভৌমিক, সাহাবউদ্দিন মিন্টু ও স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খসংগঠিত করার কাজ শুরু হয়।

এপ্রিলে পাকিস্তানি বাহিনী নোয়াখালীতে প্রবেশ করার কিছুকাল পরও গোপালপুর রয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের দূর্জয় ঘাঁটি হিসাবে; পরিণত হয় মুক্তিযোদ্ধাদের রিক্রুটিং সেন্টারে। চলতে থাকে যুদ্ধের প্রাথমিক কলাকৌশলের ট্রেনিং। সময়ের সাহসী সন্তানেরা দলে দলে প্রাথমিক ট্রেনিং সমাপ্ত করে চূড়ান্ত ট্রেনিং গ্রহণের জন্য গোপনে চলে যেতো বজরার বগাদিয়া আফানিয়া হয়ে ভারতের দিকে। গোপালপুর এভাবেই পালন করে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এক অগ্রণী ভূমিকা। এ খবর পৌঁছে যায় জামাত, মুসলীম লীগ ও শান্তি কমিটির মাধ্যমে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কাছে। তারা কয়েক দফা চেষ্টা চালায় এ এলাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকদের খুঁজে বের করার জন্য। দেখতে দেখতে চলে আসে বর্ষা।

সময়টা ১৯৭১ সালের আগস্ট মাস। প্রচুর বৃষ্টি হয় সেবার ১৮ আগস্ট রাতে। ভোররাতে বেগমগঞ্জ লক্ষীপুর সড়কের কাছে বাংলাবাজার শামসুননাহার হাইস্কুলে এসে অবস্থান নেয় বেশ কিছু পাকিস্তানী মিলিশিয়া ও রাজাকার। ১৯ আগস্ট সকাল বেলা - সূর্য তখনো মেঘের আড়ালে ঢাকা। গুড়িগুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সকাল আনুমানিক আটটা নাগাদ গোপালপুর বাজারে পৌঁছে যায় প্রায় কয়েকশ পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকার। তারা দুভাগে বিভক্ত হয়। রাজাকারদের কুড়ি/পঁচিশ জনের একটি দল বাজারের পশ্চিমদিক দিয়ে এবং বাকীরা মূল রাস্তা দিয়ে এসে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সকাল থেকেই বাজারের প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান অগণন মানুষের প্রাণচাঞ্চল্যে মুখরিত ছিলো। কেউ চা পানে রত। আবার কেউ গতরাতে আশেপাশের কোন কোন এলাকায় গোলাগুলি হয়েছে তার অবস্থান নির্ণয় নিয়ে বিতর্করত। এমন সময় অতর্কিত হানা দিলো পাকিস্তানী হায়েনার দল। যারা পালাতে পারলো তারা বাঁচলো। যারা পারেনি এরকম অর্ধশতাধিক দূর্ভাগা নিরীহ গ্রামবাসী ও দোকানী শিকার হল নির্মম হিংস্রতার। একে একে ওদের সবাইকে ধরে এনে এক লাইনে দাঁড় করানো হয় বাজারের পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছোট্ট খালটির পাড়ে। এ দলে ছিলেন ঐ এলাকার শান্তি কমিটির নেতা। তার অপরাধ তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন। তাঁর কাছে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর কমান্ডিং অফিসার জানতে চায়- আনিস ডাক্তার, সুবেদার মেজর জবেদ আলী কোথায়? কোনো দেশপ্রেমিক মুক্তিপাগল মানুষ তাদের এ প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য নয় এবং তারা এর কোন জবাব কোনদিনই পায়নি। বাজারের দোকানে দোকানে তল্লাশি করে খুঁজতে থাকে স্বাধীন বাংলার পতাকা। জনৈক ছিদ্দিকউল্যাহর দোকানে ওরা পেয়ে যায় স্বাধীন বাংলার একটি পতাকা।- ক্রোধে ফেটে পড়ে ওরা। লাইনে দাঁড়ানো কয়েকজন মুসল্লিকে ছেড়ে দেয়া হয়। বাকী প্রায় পঞ্চাশজন নিরপরাধ নিরস্ত্র মানুষকে ব্রাশফায়ার করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ব্রাশফায়ারের পরও যারা বেঁচেছিলো তাদেরকে বেয়নেট চার্জ করে পৈশাচিক উ‍ল্লাস প্রকাশ করার পর পাকিস্তানী পশুরা হত্যা করে। মানুষের তাজা রক্তে সয়লাব হয়ে যায় খালের পানি। রক্ত আর পানিকে পার্থক্য করা যায়নি। এই হতভাগ্য মানুষদের অপরাধ ছিলো- তারা বলেনি কারা এ‍লাকার মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, কারা মুক্তিযোদ্ধা। তাদের অপরাধ, দোকানে পাওয়া যায় স্বাধীন বাংলার পতাকা।

এই হত্যাকান্ড জঘন্য বর্বরতা। মানবতাবিরোধী। নোয়াখালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে গোপালপুরের এই গণহত্যা এক কালো অধ্যায়। এই ঘটনায় যারা শহীদ হন তাদের পঁচিশ জনের নাম পরিচয় উদ্ধার করা সম্ভব হয়:
১. মাহবুবুল হায়দার চৌধুরী [নশা মিয়া] (গোপালপুর)
২. দীন ইসলাম (তুলাচরা)
৩. হাবিব উল্যাহ (তুলাচরা)
৪. ইসমাঈল মিয়া (তুলাচরা)
৫. অহিদউল্যাহ (সাহাদাপুর)
৬. মোহাম্মদউল্যাহ (সাহাদাপুর)
৭. মোহাম্মদ উল্যাহ (সাহাদাপুর)
৮. দুলাল মিয়া (সাহাদাপুর)
৯. সামছুল হক মাস্টার (আটিয়াকান্দি)
১০. মজিবউল্যাহ (আটিয়াকান্দি)
১১. বশিরউল্যাহ (আটিয়াকান্দি)
১২. আবুল কাশেম (মির্জানগর)
১৩. আবুল বশর ছিদ্দিক (মির্জানগর)
১৪. হারিছ মিয়া (দেবকালা)
১৫. ছিদ্দিক উ‍ল্যাহ মিয়া (সিরাজউদ্দিনপুর)
১৬. মমিনউল্যাহ মিয়া (মুহুল্লাপুর)
১৭. মন্তাজ মিয়া (মহল্লাপুর)
১৮. নূর মোহাম্মদ (মহল্লাপুর)
১৯. আবদুল মন্নান (মহল্লাপুর)
২০. মোবারক উল্যাহ (পানুয়া পাড়া)
২১. মোহাম্মদ উল্যাহ দর্জি (চাঁদ কাশেমপুর)
২২. আবদুর রসিদ (আমিরাবাদ)
২৩. আবদুল সাত্তার (বারাহীনগর)
২৪. আবদুল করিম (হীরাপুর)
২৫. ডা: মোহাম্মদ সুজায়েত উল্যাহ (দশঘরিয়া, চাটখিল)

১৯৭১ সালের ১৯ আগস্টের এই নিষ্ঠুর গণহত্যার স্মরণে গোলাম ছাত্তার নোমান, তপন কুমার ভৌমিক প্রমুখের প্রচেষ্টায় ১৯৮০ সালে শহীদদের নাম খোদাই একটি স্মৃতিস্তম্ভ ও শহীদ স্মৃতি সংসদ গড়ে উ‌ঠে‍। প্রতি বছর এই দিনে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।


[লেখক: গোলাম আকবর, সদস্য সচিব, নোয়াখালী মানবাধিকার জোট]

ফেইসবুকে যোগ করুন